একটি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী - ছোট গল্প

একটি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী

একদম আড়ালে। সামনে একটি কড়ই গাছ। গাছ ঘেঁষে নুইয়ে জড়সড় হয়ে আছি। গাছটি ফুটপাতের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। হালকা অন্ধকার। সময় ভোরের প্রাম্ভেই, ঠিক চারটে বাজতে ২ কি ৩ মিনিট বাকী। আশে পাশে পরিচিত মুখও রয়েছে। তারাও আমার মতোই নিজেকে বাঁচাতে আড়াল হবার পথ খুঁজছে। কেউ কোনো শব্দ করছে না। অদূরেই গাছ থেকে ঝড়ে পড়া শুঁকনো পাতার স্তূপ। যেখানে কিছুক্ষণ আগেই আগুণ ধরিয়ে গিয়েছিল, শফিক। শফিক একটি টং দোকানের দোকানদার। ফুটপাত ঘেঁষেই কিছু টং দোকান গড়ে উঠেছে। দিনের বেলায় সব দোকানগুলোই খোলা থাকে। চা-বিস্কুট, পানি, কেক, পিঠা, চানাচুর, সিগারেটও পাওায়া যায়। রাতের বেলায় শুধু মাত্র শফিকের দোকানটি খোলা থাকে। মানে দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টাই শফিকের দোকান খোলা। সেই সুবাদে রাতে দরকারে অদরকারে শফিকের দোকানে যাওয়া যায়। যেমনটি আমিও এসেছিলাম অদকারেই। রাতে ঘুম হচ্ছে না বলে বাইরে বের হলাম, মনে মনে উদ্দেশ্য ছিল- একটু হাঁটাহাঁটি করে, যখন ফজরের আযান পড়বে, তখন সোজা মসজিদে চলে যাবো।

কিছুক্ষণ আগেই হাঁটতে হাঁটতে শফিকের দোকানে এসে থেমেছিলাম। সেইখানে অনেক লোকের আনাগোনা লক্ষ্য করেছিলাম। যেহেতু সিগারেট খাওয়ার বদভ্যাস আগে থেকেই ছিল, তাই একটি সিগারেট ধরালাম। সিগারেট ধরিয়েই দুই-তিন টান দিতে না দিতেই এমন এক কাণ্ড ঘটে গেল আমার সামনে, যেখানে আমি আড়াল হতে প্রাণপণ চেষ্টায় আছি। হাতে তখনও সিগারেটটি জ্বলছিল। একবার মনে হচ্ছে ফেলে দেই, কিন্তু সেই সিগারেটটিকে এতো আপন মনে হচ্ছিলো আর একটা কথা বারবার কানে বাজছিল, এটাই বোধহয় আমার শেষ সিগারেট। মরার আগে সিগারেটটা থাকুক কিছুক্ষন সঙ্গী হয়ে। যেমনটা বিভিন্ন সিনেমায় ভিলেনের মৃত্যুর সময় দেখানো হয়, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে ভিলেন সিগারেট হাতে নিয়ে এক টান দেয়। কী অদ্ভুত! তবে কি আমি ভিলেন! আমিতো নায়কও নই, না পরিচালক।

যখন দোকানে বসেছিলাম, তখন কিছু কিছু লোক যারা নিজেদের মধ্যে কী একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিল, তা বুঝতে পারিনি। তবে তাদের চোখে মুখে অস্থিরতার ছাপ ছিল সেইটুকু বুঝেছিলাম। আমার এমনিতেই আগ্রহের কমতি আছে, এদের কথোপকথনের বিষয়বস্তু জানার আগ্রহ নেই বললেই চলে। আমি যে এলাকার কথা বলছি, সেটা শহরেরই একটা এলাকা, যেখানে সকল ধরনের মানুষের বসবাস গড়ে উঠেছে, সরকারী বে-সরকারি অফিস থেকে শুরু করে বাজার, হাঁসপাতাল, স্কুল, কলেজ, এমনকি ইয়ুনিভার্সিটিও রয়েছে। এই শহুরে গড়নে যেখানে সব ইট আর পাথর, সেখানে এই এলাকাটি বেশ খোলামেলা আর মফস্বল মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে এখানে কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ঘটে যা শহরের একেবারাই স্বাভাবিক, ঘুষ দেয়া-নেয়া থেকে দালালী সব চলে এখানে। যেন টাকার মেশিন থেকে টাকা উড়ে আর সবাই টাকার পিছনে হন্যে হয়ে দৌড়ায়। রাত হলেই অপকর্মের সদস্য যারা আছে, তাদের অপকর্ম সাধনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরে। যদিও এই এলাকাটিতে সরকার কর্তিৃক নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাটি রয়েছে, তবুও এখানেই বে-আইনী কাজের সমারহ। দে-ধারছে চলছে এই অপকর্মগুলো।

সেই রাতের ঘটনায় চলে যাই, যখন আমার অবস্থা বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে। নিজের জীবন নিয়ে সংশয়। সৃষ্টিকর্তার নাম নিতে নিতে নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইলাম তার নিকট। সেই কড়ই গাছের আড়ালেই, হাতে তখনও সিগারেটটি জ্বলছিল। অদূরেই যেখানে শুঁকনো পাতার স্তূপ সেখানে পাতাগুলো পুড়ছে এখনো, সেই গন্ধ একেবারে নাকে এবং চোখে এসে কাঁদিয়ে দিচ্ছে আমাকে। আবছা আলো, ভোর শুরু হবার মুহূর্ত। রাস্তায় এক মধ্যবয়স্ক লোক, তার পরনে সাদা ফুল হাতা শার্ট আর নীল রঙের জিন্স প্যান্ট। দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের মতো। চোখ থেকে অশ্রু বের হচ্ছে, সে হতভম্ব! লোকটির কী করা উচিৎ তা নিশ্চয় ঠিক করতে পারছে না। কিছু লোককে দেখা যাচ্ছে, যাদের হাতে সেই অস্ত্র, যা দ্বারা তাদের অপকর্মগুলো সাধিত হয়।

একটি ছেলে মাটিতে পরে আছে। তাঁর দেহে প্রাণ নেই। প্রাণ কেড়ে নিলো সেই অস্ত্র। ছেলেটির বুক থেকে রক্ত গড়িয়ে পরছে রাস্তায়। রক্তাক্ত রাস্তায় একটি ছেলের নিথর দেহ। সেই অসাড় দেহের দিকে তাকিয়ে বাবা। বাবার মুখে নেই কোনো অনুভূতির ব্যাখ্যা। এই মুখ কী নির্দেশ করে তা আমি জানি না।