‘মানুষের অভাব নাই’ – কতো অদ্ভুত আমরা!




আমরা খুবই অদ্ভুত (বিস্ময়কর), তাদের সাথে দেয়া-নেয়া করি,
আমারা আটক থাকি, বাকীর হিসাবে জিম্মি থাকি,
ছাই উড়াতে ভালোবাসি, আরও ভাললাগে পুড়াতে,
আমরা মানব জাতি, আমরা খুবই অদ্ভুত (অসাধারণ)।

এই কিছুক্ষণ আগে যে পাখিটা আমার চোখের সামনেই উড়ে এসে বসেছিল। তার কথাই ভাবছিলাম, হয়তো সারাদিন রোদে উড়ে বেড়িয়ে কিছুই পায়নি খাবার জন্য। খুবই করুণ সুরে ডাকছিল। হয়তো তার ছোট্ট নীড়ে নব অতিথি, তাদের মা’র জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কখন মা পাখিটা খাবার নিয়ে আসবে, আর তাদের পেটে কিছু দানা পরবে। কতো অদ্ভুত!

এই ভালোবাসার দৃশ্যটি কল্পনায় কতো মধুর, নিজেকে আরও ভালবাসতে ইচ্ছে করে! ভালোবাসার শক্তি - কঠিন শক্তি। কিন্তু আমাদের এই কঠিন শক্তি দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে সাগরের ঢেউয়ের অতলে। আজ আমরা ঘটা করে পালন করি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, এই দিবসের বিষয়টি তো প্রতিদিনকার হবার কথা। কিন্তু কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?

দিন যতই যাচ্ছে আমরা আমাদের হারাচ্ছি কিছু মরীচিকার পিছনে দৌড়ে। ছুটতে ছুটতে বহুদূর চলে গেছি, যেখানে ভালোবাসার শক্তি অক্ষম হয়ে পরেছে। এই অক্ষমতা কাদের? অবশ্যই আমাদের। আমরা যেমন নিজেদের ভালোবাসা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি ঠিক একই ভাবে অন্যকে এবং দেশকে ভালবাসতে অক্ষম হয়ে পরছি। এর গোড়া কোথায়? কোথায় আটকে আছি? আমাদের মনে ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা এবং হিংস্রতা জায়গা দখল করে আছে। সবখানেই তা ছড়িয়ে পরেছে। যখন রাস্তায় বের হই, তা হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করা যায়। যখন পত্রিকায় চোখ বোলাই তখন টের পাওয়া যায়, যখন ফেসবুকে লগইন করি তখন বুঝা যায়।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই এবং প্রতিটি জাতির অস্থিমজ্জায় নানা সমস্যার ব্যামো রয়েছে। আমারা এই ব্যামো নিয়ে অলোচনা-সমালোচনা করে চলছি এবং ভবিষ্যতেও করতেই থাকবো। একের পর এক ব্যামো আমাদের চোখের সামনে আসে, আমরা তা দেখে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গুষ্টি উদ্ধার করেতে ব্যস্ত, কিন্তু তার উপযুক্ত সমাধানে কেউ এগিয়ে আসি না। যদিও কেউ কেউ আসে তার সমালোচনার ঝড় তুলতে কার্পণ্য করি না। এ কেমন সমাজ!

সেই ফেলানি হত্যা থেকে শুরু করে সাগর-রুনি হত্যা, বিশ্বজিৎ এমনকি১৩ বছরের শিশু রাজন হত্যা। তারপরও থেমে নেই এই হত্যাযজ্ঞ। কতো শত তদন্ত কমিটি, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, আইন-আদালত এইগুলো কি থামাতে পেরেছে? বিপরীতে তা দিনে দিনে দিগুণ হারে বাড়ছে।
রানা প্লাজা, তাজরিন গার্মেন্টস শত শত ভয়াবহ অগ্নিকান্ড চোখের সামনেই হাজার হাজার মানুষের লাশ। তারপর সমাধানের পথ অবলম্বন করা। কোথায় তার সামাধান কি মিলেছে? অগ্নিকান্ড বেড়েই চলেছে।

এরকম অনেক বর্বরতা আমাদের মানুষের ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে। আমাদের মনে ধ্বংস করা ছাড়া কিছুই নেই। কেউ ভালো থাকুক তা আমারা চাই না। আমাদের চিন্তায় ঘুণ পোকার অভয়ারণ্য। চেতনা ধ্বংস ধ্বংস খেলায় পরিনত হয়েছে।

একটি ব্যক্তিগত ঘটনা বলি, কোন একদিন রিক্সায় আসছিলাম। রাস্তার প্রস্থ কম হওয়ায় মুখোমুখি একটি প্রাইভেট কার আসছিল। গাড়ির মালিক গাড়ি থেকে বের হবে বলে গাড়িটি থামল। গাড়ির দরজা খুলে বের হবার সময় আমার রিক্সা (আমি যে রিক্সায় ছিলাম) ব্রেকে ছিল। মালিককে দেখে বেশ সুশীল সমাজের বাসিন্দা মনে হল। গাড়ি থেকে বের হতে হতে রিক্সাওয়ালা এবং আমার দিকে এমন ভঙ্গিমায় তাকাল যেন তার মুখে কাঁদা লাগলো। বিরক্ত এনে বলল, “মানুষের অভাব নাই”

সত্যি তো মানুষের অভাব নাই। তাই তো ধরে ধরে হত্যা করলেও মানুষের অভাব থাকবে না। মানুষ বাড়বেই। আমার মনে হয়, তার মতো যারা মনে ধারণ করেন, ‘মানুষের অভাব নাই’ তারা হয়তো হত্যাযজ্ঞের খবর পেয়ে কিছুটা আনন্দবোধ করেন। তাদের হৃদয়ে তাদের সম শ্রেণী কিংবা তার থেকে উচ্চ শ্রেণীর মানুষকেই মানুষ বলে ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়।

ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ, ইভ-টিজিং, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অসম্মান করা, অপমান-অপদস্ত করা, অশালীন গালাগালি করা, কথায় কথায় গাঁয়ে পরে মারামারি করা এই অভ্যাসগুলো আমাদের রক্তে মিশে গেছে। নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে করি, দুর্বলের দুর্বলতা খুঁজি আমরা।

ইদানিং ধর্ষণ অভ্যাসের প্রসারতা ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। আমি কিংবা আপনি নিজেও একজন ধর্ষক যখন কোন মেয়ের দিকে কু-নজরে তাকাই/তাকান। তখন নিজের মধ্যে এক পশুবৃত্তি আচরণগুলো জেগে উঠে কি? তার দেহের মাংসপিণ্ডের প্রতি লোভ হয় কি? আমার আসে-পাশে এমন মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পরেছি। আমি নিজেও মাংস লোভী পশুতে পরিনত হয়ে পরেছি।

প্রকৃত ধর্ষক আর আমার বা আপনার মধ্যে এইটুকু পার্থক্য। আমি চিন্তায় চিন্তায় ধর্ষণ করি, আর তারা চিন্তাকে বাস্তবে রুপ দেয়। আমি এমন বেশ কয়েক জনের মনে পতিক্রিয়া জানতে পেরেছিলাম, তারা নিজেদের সাথে ধর্ষকদের কিংবা ইভ টিজারদের তুলনা করে ভালো সাজতে চায়। প্রকৃতপক্ষে ভালো এইটুকু যে, তারা চিন্তাকে বাস্তবে আনছে না। কিন্তু একজন প্রকৃত ধর্ষকের প্রাথমিক চিন্তা আর আমার/আমাদের প্রাথমিক চিন্তা প্রায় কাছাকাছি, তাই নয় কি?

আমি বিশ্বাস করি, যে দেশে প্রায় চল্লিশ বছর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এখন হতে পারে, সে দেশে মধ্য রাতের আঁধারে বিল্লু মুচি হত্যার বিচার অবশ্যই হতে পারে। এখনে সূক্ষ্ম পার্থক্য। একজন জাতির পিতা আর একজন মুচি। তবে সে যাইহোক একজন মানুষ হত্যার বিচার যা হওয়া উচিৎ তাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আমরা যে কতটা পুষ্টিহীনতায় ভুগছি তা মাঝে মাঝে আমরা নিজেরাই বুঝিয়ে দেই। কিভাবে? ফেসবুক একটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, এখানে এমন কিছু কমেন্ট, পোস্ট শেয়ার করি যা আমাদের ভাবায় আমরা কতোটা রোগা হয়ে যাচ্ছি। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, আজেবাজে কমেন্ট করতেই থাকি।

পোলিও রোগ নিরাময়ের লক্ষ্যে ছোট ছোট শিশুদের পোলিও টিকা দেয়া হয়। ঠিক তেমনি প্রতিটা মানুষকে মানুষ হবার টিকা দেয়া গেলে খুব ভালো হত। আমার মাঝে মাঝে এমন টিকার সন্ধান পেতে ইচ্ছা করে। মেডিক্যাল সাইনটিস্টদের কাছে অনুরোধ করি, আপনারা এই ব্যপারে গবেষণা করে কিছু একটা উপায় বের করেন। ধরে ধরে মানুষ হবার টিকা দেয়া হবে।

আমি এবং আপনি কী করতে পারি? বড়জোর ফেসবুকে দুইএকটা পোস্ট, কমেন্ট, বন্ধুদের আড্ডার মাঝে দুই একটা গালাগালি। এরপর??? সব আগের মতোই সকালে ঘুম থেকে উঠে যে যার মতো ব্যস্ত।ফেসবুকে যতই চিল্লাচিল্লি করি তাতে কিচ্ছু হবে না। এই চিল্লাচিল্লি যদি এলাকায় এলাকায় মাইক দিয়ে প্রচার করি, তবে কিছুটা হলেও কাজ হতে পারে। অন্তত কারো মনে আঘাত করতে পারে। আর সেই আঘাতে যদি কেউ তার পশুবৃত্তিকে নিবৃত করতে পারে, তাহলে সেইটুকুই প্রাপ্তি।

আমাদের দরিদ্র সমজের বেশিরভাগ মানুষ শিক্ষিত না, আর কিছু শিক্ষিত থেকেও সু-শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। এরা যখন বাবা-মা হয় তখন সেই সন্তানকেও সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে চেষ্টা-সাধনা করেও মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতা চলেতেই থাকে ফলে সমাজে সু-শিক্ষিত মানুষ খুব কম দেখা যায়। তাই আমাদের করনীয় হতে পারে, প্রতিটা নব দম্পতিকে সন্তান লালন-পালনের শিক্ষাটা নিয়ে সন্তান জন্ম দেয়া।

আমি আপনি যত কথাই বলি না কেন কথার চেয়ে কাজে মনযোগী হতে হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ শুধুমাত্র ফেসবুকে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যায়কে প্রতিহত করুন। ফেলানি ন্যায্য বিচার পেত যদি সে আমার/আপনার বোন হত, এবার রাজন হত্যার ন্যায্য বিচার হবে, যদি সে আমার/আপনার ভাই হয়।

সেই পাখিটি ফ্রুত করে উড়ে গেল। ঘুরে ফিরে ক্লান্ত হয়ে নীড়েফিরল তার বাচ্চাদের জন্য খাবার জোগাড় করে, ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পেরে মা পাখিটির সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। ভালোবাসা হোক সকলে জন্য। সবার মাঝেই ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে যাক।

আমরা খুবই শান্ত, শান্তি প্রিয় এবং সামাজিক,
শিখেছি ভালবাসতে, অপরকে ভালবাসাতে,
অপরের মাঝে আপনারে খুঁজি,
আবারও ভালবাসতে চোখ বুজি।