সন্তানের পড়ালেখা যত্ন

Image Source: bubblespan dot com

সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে সব বাবা-মা ই চিন্তিত থাকেন সবসময়। ভালো স্কুলে দেয়া, গৃহশিক্ষক রাখা, কোচিংয়ে ভর্তি করা, বাসায় নিয়মিত তদারকি সব কিছুই করার চেষ্টা করেন সচেতন বাবা-মা। আমার গত পাঁচ বছরের শিক্ষতার অভিজ্ঞতা থেকে আমি স্টুডেন্টদের কিছু কমন সমস্যার কথা আলোচনা করবো যা হয়তো অভিভাবক এবং টিচারদের সহায়তা করবে ওদের যথাযথ যত্ন নিশ্চিত করতে।

১. কোন কিছু বুঝতে না পারলেও বাচ্চারা অনেক সময়েই চুপ করে থাকে, কিছু বলে না। হয়তো ভয় কিংবা লজ্জা থেকে। মুখে বুঝেছি বললেও দেখা যায় ভালোমত বুঝতে পারেনি। ওদের অভিযোগ, বকা-ঝকা না করে শিক্ষক, অভিভাবকদের আরো বেশী বন্ধুভাবাপন্ন হতে হবে যাতে করে বাচ্চার সব কিছু নির্দিধায়, সাবলীলভাবে জিজ্ঞাসা করতে পারে। আর ওদের বোঝাতে হবে প্রশ্ন করার গুরুত্ব, কোন কিছু ভালোমত বুঝে নেবার প্রয়োজনীয়তা, জাগিয়ে তুলতে হবে কিশোর মনের অদম্য কৌতূহল।

২. সারাদিন ক্লাস, কোচিং, বাসায় একাধিক টিচারের কাছে পড়তে পড়তে নিজে বাসায় পড়ালেখা করার মত সময় ওদের অনেক কম। সেখানে আমরা পড়া দেবার সময় ওদের সময় এবং সামর্থ্যের কথা একেবারেই চিন্তা করি না। ফলে অতিরিক্ত চাপে ভোগে বাচ্চারা। এই চাপের ফলেই অনেক সময় দেখা যায় সব কিছু ভালো মত শেষ করতে পারছে না। আর এটা কিছু চললে Chronic রূপ ধারন করে যা বাচ্চাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। অনেক সময় পড়া একটু কমিয়ে দিলে অনেক ভাল পারফর্মেন্স দেখাতে পারে। Productivity ও অনেক বেড়ে যায়।

৩. বাবা-মা অতি প্রত্যাশায় এবং অন্যান্যদের সাথে প্রতিযোগিতার জন্য পড়ালেখার জন্য এত চাপ দেয় বাচ্চাদের যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ওদের মাঝে। অল্প বয়সেই হতাশায় ভোগে। তাছাড়া শুধু মুখস্থ পড়ে আশানুরূপ ফল পাওয়ার কারনে কোন কিছু বোঝা যা জানার প্রতি অনাগ্রহ দেখা যায়। ওদেরকে বোঝাতে হবে রেজাল্ট মানেই জীবন নয়।  বাবা-মাকেও বুঝতে হবে। শিক্ষক হিসেবে ওদের মনের সুকুমার বৃত্তিগুলো জাগ্রত করতে উৎসাহ দিতে হবে, নতুন কিছু জানায় আগ্রহ তৈরি করতে হবে ওদের মাঝে, বই পড়তে, খেলাধূলায় উৎসাহ দিতে হবে। অজানা ভুবনকে ওদের সামনে তুলে ধরতে হবে। নৈতিকতার বীজ বপন করে দিতে হবে ওদের কিশোর মনে যাতে বড় হয়ে একজন মানুষের মত মানুষ হয়। সেটাই হবে একজন শিক্ষকের পরিপূর্ন সার্থকতা।

৪. ছাত্র মাত্রই ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা কম বেশী থাকবে। এখানে অভিভাবক এবং শিক্ষককে কিছুটা মননশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পড়ার বিষয়গুলোকে গতানুগতিকতা পরিহার করে এমন ভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন ওরা উৎসাহ পায়। নিজের ভিতর থেকে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। শুধু এই "আগ্রহ" সৃষ্টি করতে পারলে ছাত্রকে স্বাভাবিক ক্ষমতার অনেক বেশী কিছু আদায় করিয়ে নিতে পারবেন। অনেক সময় পরিমিত ফাঁকি দেয়ার সুযোগও ইতিবাচক কাজ করে। তবে সব সময়ই ছাত্রের মানসিক অবস্থার খেয়াল রাখতে হবে। অনেক সময় বুঝতে না পারলে, কঠিন মনে হলে পড়া ফেলে রেখে দেয় এবং নিয়মিত ফাঁকি দেয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। তাই ওদের মত করেই, ওদের গ্রহন করার ক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুসারে কোন কিছু ব্যাখ্যা করা উচিত।

৫. এখনকার বাচ্চাদের বিনোদনের মাধ্যম অনেক কিন্তু সেগুলো অনেকটা মনযোগ নষ্টকারী। বেশীর ভাগই ইলেক্ট্রনিক পণ্য নির্ভর। সারাক্ষন মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাবলেট ইত্যাদির ব্যবহার পড়ালেখায় মনঃসংযোগের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, আসক্ত তৈরিকারী এবং শারিরিক খেলাধুলার মত মস্তিস্ককে সতেজ ও প্রানবন্ত করতে পারদর্শী নয়। তাই বাচ্চাদের সঠিক, পরিমিত ও কার্যকরী বিনোদনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে ফ্রেশ মনে, নতুন উদ্যমে, উৎসাহের সাথে পড়ালেখায় মনযোগ দিতে পারবে।

পরিশিষ্টঃ এই প্রবন্ধটি বালিয়াটি ঈশ্বর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের ই-ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত।